পঞ্চান্নতম অধ্যায় দক্ষিণ পাহাড়ের বাগান প্রতিষ্ঠিত পথে

বিশাল তাং সাম্রাজ্যের দুষ্টু শিশু হালকা বাতাসে ভেসে চলা নৌকা 2472শব্দ 2026-03-20 03:16:06

ফুলের বাজার।

ছিন ইয়ান ও চারানব্বই দু’জনে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ফুলের বাজারের দোকানিরা ছিন ইয়ানকে দেখে যেন ধনদেবতা দেখেছে, সবাই হাসিমুখে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘‘ছোট বাবু, দেখুন তো এসব ফুল কতটুকু টাটকা।’’

ছিন ইয়ান হাঁটতে হাঁটতে হাত নাড়লেন তাদের দিকে। তবে একটি ফুলের বাগান ছিল বেশ স্বতন্ত্র; সেখানে এক বৃদ্ধ ফুলচাষী কাঁচি হাতে ডাল ছাঁটছিলেন, বাইরের কোলাহলে তার ভ্রুক্ষেপ নেই।

ছিন ইয়ান ভেতরে ঢুকলেন, চোখে ঝিলিক ফুটল। সত্যিই, এ বাগানের ফুল অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বল।

বৃদ্ধ সদ্য জল দিয়েছেন, পাতায় পাতায় জলকণা চিকচিক করছে।

‘‘কোন ফুল পছন্দ হলে বলেই দিন, বাবু,’’ বৃদ্ধ একবার তাকিয়ে নিয়ে ফের নিজের কাজে মন দিলেন।

চারানব্বই কিছু বলতে যাচ্ছিল, ছিন ইয়ান তাকে থামালেন। ফুল ভালো হলেই হলো, ফুলচাষীর মেজাজ থাকা স্বাভাবিক।

ছিন ইয়ান এমন মানুষকে ভালোবাসেন, যারা নিজস্ব ভালো লাগার কাজে মনোযোগ দিয়ে নিখুঁত করে তোলে।

তিনি বেছে নিলেন কুড়ির বেশি পিওনি, সঙ্গে আরো কিছু শাওয়াও ও চা-ফুল।

বাজারের সবাই তার গতিবিধি লক্ষ করছিল, দেখে মনে হচ্ছিল বৃদ্ধের ফুলবাগানটা ছিন ইয়ান কিনেই নিলেন, ফলে বাকিরা কিছুটা হতাশ হয়ে ঈর্ষায় তাকাল।

ছিন ইয়ান এ দৃষ্টি বুঝতে পেরে হেসে উঠলেন, ‘‘চারানব্বই, প্রত্যেক দোকান থেকে দশ-পনেরো রকম ফুল বাছাই করে কিনে নাও।’’

চারানব্বই আনন্দে সাড়া দিল।

বৃদ্ধ এবার বিস্ময়ে তাকালেন, ‘‘আপনি নিশ্চয়ই সেই কিংবদন্তির ছোট বাবু?’’

‘‘ঠিক তাই,’’ ছিন ইয়ান মাথা নাড়লেন।

তবে বৃদ্ধ অবাক করা কিছু দেখালেন না, বরং গোঁফে হাত বুলিয়ে হাসলেন, ‘‘নতুন প্রজন্ম সত্যিই অসাধারণ, এত কমবয়েসেই কত সাহস!’’

ছিন ইয়ান জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তাহলে দাদু আমাকে অপচয়ী মনে করেন না?’’

বৃদ্ধ হাসলেন, ‘‘আমার মতে আপনি নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এমন করছেন। এত টাকা দিয়ে কিছু কিনতে পারা মানেই তো অনেকে চেয়ে এগিয়ে!’’

‘‘দাদু, আপনি বাড়িয়ে বলছেন,’’ ছিন ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে ডাল ছাঁটা শুরু করলেন, ‘‘আমার কাছে অনেক ভালো মানের সার আছে, কিছু আপনাকে দেব।’’

বৃদ্ধের ম্লান চোখে আলো জ্বলে উঠল, ‘‘বাগানের সার? সেটা কি শহরে যার কথা শোনা যায়, গাছ বাঁচিয়ে তোলে এমন ওষুধ?’’

ওষুধ?

এই নাম শুনে ছিন ইয়ান একটু হাসলেন।

‘‘ওটা আসলে ওষুধ না, শুধু মাটিকে উর্বর করে, ফলে গাছের শিকড় খাবার পায়, ভালোই বাড়ে।’’

বৃদ্ধ আনন্দিত হয়ে বললেন, ‘‘তাহলে অনেক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই বাগানের ফুল আপনি ইচ্ছেমতো বেছে নিতে পারেন।’’

ছিন ইয়ান হাসিমুখে সম্মতি দিলেন।

শেষমেশ, এত ফুল কিনে নিতে হয়েছে পাঁচটি বিশাল গাড়ি, সারাবাজার আনন্দে ভরপুর।

কে বলে ছোট বাবু অপচয়ী? তিনি তো আসলে ধনদেবতা!

‘‘এই দু’গাড়ি ফুল যাবে দক্ষিণ শৈল বাগান, বাকি সব যাবে ছিন পরিবারে,’’ ছিন ইয়ান গাড়োয়ানকে নির্দেশ দিলেন।

গাড়োয়ান চাবুক ছুঁড়ে গাড়ি ঘুরিয়ে দক্ষিণ শৈল বাগানের দিকে চালাল।

ছিন ইয়ান ফুল কেনাতেও এতটা অঢেল খরচ করে চ্যাং-আন শহরের সবাইকে অবাক করে দিলেন।

‘‘মালিক, এত ফুল কোথায় রাখব?’’ চারানব্বই জিজ্ঞেস করল।

ছিন ইয়ান নির্দেশ দিলেন, ‘‘সব পিওনি রাখো ফুলবাগানে, যত্ন করে দেখো। চা-ফুল রাখো পাথরের রাস্তার পাশে, শাওয়াও কয়েক পাত্র মূল ফটকের সামনে।’’

চারানব্বই কর্মচারীদের নিয়ে কাজ শুরু করল।

ফুল সত্যিই বাড়িতে রঙ এনে দেয়।

ছিন ইয়ান পরিশ্রম করে সব ফুল আর টব জায়গামতো সাজালেন, পুরনো বিবর্ণ ছিন পরিবার এক লহমায় হয়ে উঠল শোভাময় ও মনোরম।

ছিন ছিয়ং সেনা শিবির থেকে ফিরে পুরো নতুন ছিন পরিবার দেখে মনে করলেন, বুঝি ভুলবশত অন্য বাড়ি ঢুকে পড়েছেন।

তিনি বেরিয়ে গিয়ে ভালো করে দরজার ফলক দেখলেন।

ফলকে বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘‘ছিন রাষ্ট্রপতির বাড়ি।’’

ভুল আসেননি।

ছিন ছিয়ং বিস্ময়ে অন্ধকারে হাতড়ে ভেতরে ঢুকলেন।

বাইরে রঙিন শাওয়াও ফুলের ছটা, চোখে পড়ার মতো সৌন্দর্য।

তিনি দ্রুত মূল কক্ষে ঢুকলেন।

ছিন ইয়ান আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন।

‘‘বাবা, চা খান,’’ ছিন ইয়ান চা ঢেলে উঠে বাবাকে প্রধান আসনে বসালেন।

ছিন ছিয়ং কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ছিন ইয়ান চা হাতে দিয়ে বলল, ‘‘চা খান।’’

ছিন ছিয়ং বাধ্য হয়ে চুমুক দিলেন, তারপর মুখ নেড়ে জিজ্ঞেস করতে চাইলেন, এত ফুল কিভাবে এলো, কত খরচ হলো?

‘‘বাবা, আঙুর খান।’’

ছিন ইয়ান দ্রুত একটি বড় আঙুর বাবার মুখে তুলে দিল।

‘‘বাবা, বাইরে সব ফুল আমি ফুলবাজার থেকে কিনেছি, খুব বেশি খরচ হয়নি, কেবল একশো গুয়ান।’’

ছিন ছিয়ং চোখ বড় করে তাকালেন, একশো গুয়ান!

‘‘ওগুলো বেশ দামি পিওনি ফুল,’’ ছিন ইয়ান ব্যাখ্যা করলেন, ‘‘আর ফুলচাষী দাদু দাম কমেই দিয়েছেন। ভাবুন তো, ওয়েই伯伯ের বাড়িতে কেবল সোনালি পিওনি আছে দশ-পনেরো টব, আমাদের এসব ফুল তো কিছুই না।’’

ছিন ছিয়ং আঙুর খেতে খেতে ছেলের যুক্তি শুনে বুঝলেন, সত্যিই তো।

‘‘কিন্তু ইয়ান, তোমার তো শহরে বদনাম ছড়াচ্ছে,’’ ছিন ছিয়ং দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘‘আমি শুধু চাই কেউ তোমার সমালোচনা না করুক।’’

ছিন ইয়ান বসলেন, ‘‘অন্যের কথায় ভয় কী, এই টাকা আমি সৎভাবে উপার্জন করেছি, কেউ যদি বেশি বলে সে তো ঈর্ষায় বলে!’’

ছিন ছিয়ং এতে যুক্তি খুঁজে আর কিছু বললেন না।

ছিন ইয়ান স্বস্তি পেলেন।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে চাদর মাথায় ঘুমিয়ে পড়লেন।

তিন দিন পরে।

দক্ষিণ শৈল বাগানের সার কারখানা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলো।

লী দ্বিতীয় ছিলেন বড় সহায়, লোক নিয়োগে ছিন ইয়ানকে ভাবতেই হলো না।

লী দ্বিতীয় সরাসরি চ্যাংসুন উজি-কে পাঠালেন, দক্ষ ও পরিশ্রমী লোকের দল নিয়ে এলেন সার কারখানায়।

আদিতে এসব কারিগর আসতে চাইছিলেন না, কিন্তু বাগানে গিয়ে দেখলেন সারি সারি ফলের গাছ, ডালে ডালে ফল, যদিও এখনো পেকে ওঠেনি।

পথের শেষে কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন গজebo, পাশে হ্রদ, জলে মাছের খেলা।

গজebo পেরিয়ে দেখা গেল কারিগরদের জন্য তৈরি সারি সারি বাসভবন।

ছিন ইয়ান মূল কক্ষে, কারিগররা ঢুকতেই বললেন, ‘‘প্রত্যেক কারিগর একটি স্বাধীন ঘর পাবে, চাইলে মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান নিয়ে আসতে পারো।’’

কারিগররা অবিশ্বাসে তাকিয়ে থাকে।

এমন সৌভাগ্য নেমে এল নিজের ঘাড়ে!

ছিন ইয়ান চাবি তুলে দিলে তারা যেন স্বপ্ন ভেঙে হাসিতে ফেটে পড়ল, ‘‘ধন্যবাদ ছোট বাবু! আমরা মন দিয়ে কাজ করব, কখনো ফাঁকি দেব না।’’

ছিন ইয়ান হাসলেন, ‘‘তোমাদের যদি সত্যিই এমন সংকল্প থাকে তো ভালো, তবে বলে রাখি, আমি সেরা সুযোগ দেব, তোমাদেরও যোগ্যতা দেখাতে হবে।’’

‘‘ছোট বাবু, নিশ্চিন্ত থাকুন!’’

সবাই একসঙ্গে আশ্বাস দিল।

দক্ষিণ শৈল বাগানে শুধু বাসস্থান নয়, খাবারও চমৎকার—প্রতিদিন মাংস, খাওয়ার পরে ফল-ফলাদি।

যারা আগে আসতে চাননি, তারাও বলল, এবার তো ভাগ্য খুলে গেছে।

তারা এমন উৎসাহে কাজ করতে লাগল যে কারখানায় এক মাসেই হাজার মণ সার উৎপন্ন হলো।

বাজারে ছাড়া মাত্র একদিনেই সব বিক্রি!

এখন ছিন ইয়ানের হাতে কয়েকটি কারখানা, প্রতিদিন অঢেল উপার্জন।

তিনি যখন আরাম করে টাকা গুনছিলেন, হঠাৎ ওয়াং দে সম্রাটের ফরমান নিয়ে এলেন, লী দ্বিতীয় ডেকেছেন।