ষষ্ঠষট্টিতম অধ্যায় : দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকা চোখ…
ভেতরে গভীরভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, চুলগুলো আলতো করে ঘষতে ঘষতে শৌচাগারে যাওয়ার ইচ্ছা হলো। কিন্তু দরজার হাতলে হাত রাখতেই থেমে গেলাম, আর অবচেতনে সাবধানে হাতটা সরিয়ে নিলাম।
দরজাটা বহুদিনের পুরোনো, সামান্য ফাটল ধরেছে, বাইরে থেকে ভেতর দেখা যায়, তেমনি ভেতর থেকেও বাইরে দেখা যায়। আমি তখন নিঃশব্দে, যেন অজান্তে, ফাটলের গা ঘেঁষে বাইরে তাকালাম। অবাক হবার মতো, ফাটলের ওপাশে দেখতে পেলাম লালচে একটা দ্যুতি। প্রথমে মনে হলো, ড্রইংরুমের দেবতার আসনের টেবিলের ওপর ঢাকা লাল কাপড়টা। কিন্তু একটু ভাবতেই মনে পড়ল, ওখানে তো পুরোনো ছেঁড়া ধূসর চেক কাপড়টাই ঢাকা ছিল।
আর ফাটলটা দিয়ে বাইরে তাকালে তো কেবল মাত্র মূল দরজার চৌকাঠই দেখা যায়, দেবতার আসন তো একেবারেই দেখা যায় না। দ্বিতীয় ভাবনাটা ছিল, দরজার বাইরে কেউ লাল কাগজ সেঁটে রেখেছে বুঝি। আমাদের বাড়িতে নতুন বছর এলেই দরজার দু’পাশে লাল কাগজের শুভেচ্ছাবার্তা লাগানো হয়, হয়ত সেই কারণেই পুরোটা লাল দেখাচ্ছে।
আমি তখন কিছু ভাবিনি, দরজা খুলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু হাতটা দরজার হাতলে রাখতেই মাথার ভেতর ঝনঝন করে উঠল, এক মুহূর্তে একটা ভয়ানক চিন্তা মনে উদয় হল, আর সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেল।
হঠাৎ মনে পড়ল, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আবার ফাটলের গা ঘেঁষে বাইরে তাকালাম।
এখনও লালই দেখাচ্ছে।
মানুষ প্রবল ভয়ে চেঁচাতে পারে না, অন্তত আমি পারিনি। সেই মুহূর্তে হাত-পা জমে বরফের মতো ঠান্ডা, নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি এমনকি চিৎকার করে বিছানায় ফিরে যাওয়ারও সাহস পেলাম না। দরজার ওপাশে লাল দ্যুতি যেন ফোকাসহীন, ধীরে ধীরে ঘুরছে। দিদা দীর্ঘদিন ধরে চোখের প্রদাহে ভুগছেন, চিকিৎসা চলছে, কিন্তু এখনও পুরোপুরি সেরে ওঠেনি।
সহজ কথায়, চোখের প্রদাহ মানেই চোখ লাল হয়ে যাওয়া রোগ। অবশেষে বুঝতে পারলাম, ঘরের মধ্যে যে ভয়ানক নজরদারি অনুভব করছিলাম, সেটা কোথা থেকে আসছে। আমি যখন ফাটল দিয়ে বাইরে তাকালাম, তখন দরজার ওপাশে রক্তলাল দুটি চোখও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
দিদা।
তিনি আজ রাতে আবার ফিরে এসেছেন!
হ্যাঁ, আবার। মা গত কয়েকদিন ধরে ঠিক এভাবেই ভয়াবহ অত্যাচারে আক্রান্ত হচ্ছিলেন।
ভয়, হতাশা, আতঙ্ক আর আরও বেশি বিভ্রান্তি—সব মিলে মাথার মধ্যে ঝড় বয়ে গেল। আমি আর দরজা খুলে শৌচাগারে যাইনি, না আলো নিভিয়েছি, না ঘুমিয়েছি।
বাইরে একটুও শব্দ নেই, বুঝতে পারছিলাম না ওই চোখজোড়া এখনও আছে কি না।
এভাবেই রাত কেটে গেল। মোরগের ডাক, কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর গ্রামের ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠল। অবশেষে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, আর সেই ঘুম ভাঙল দুপুরের দিকে। জেগে উঠে মাথা ভারী লাগল, মনে হচ্ছিল ফেটে যাবে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি মা পাশের ঘর থেকে বের হচ্ছেন। দেখতে অনেক শুকিয়ে গেছেন, তবে মুখে বেশ স্বস্তি।
মা আমার দিকে তাকালেন, মুখের অবস্থা দেখে হয়ত বুঝলেন শরীর ভালো নেই। মা বরাবরই ভীরু, গতরাতের ঘটনা বলার সাহস পেলাম না, কষ্ট করে হাসলাম আর বললাম, কিছু হয়নি।
আমি ভেবেছিলাম মা শুধু এমনিই জিজ্ঞেস করেছিলেন। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা আমাকে পাগল করে তুলল।
প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল মায়ের মধ্যে কোনো পরিবর্তন এসেছে। হাঁটছেন, কথা বলছেন, খাচ্ছেন—সবই স্বাভাবিক। কিন্তু কোথায় যেন একটা অস্বাভাবিকতা, যা মুখে বলতে পারছিলাম না।
শুধু নারীদের সহজাত অনুভূতি বলে দিচ্ছিল, আমার মা একেবারেই আগের মানুষের মতো নন। আর দুই দিন পর বুঝলাম, ঠিক কোন জায়গায় তার অস্বাভাবিকতা লুকিয়ে আছে।